Showing posts with label ফিচার. Show all posts
Showing posts with label ফিচার. Show all posts

Wednesday, December 24, 2025

কুতুবদিয়া দ্বীপের খোঁজে by আফরিদা ইফরাত

ইত্তেফাকঃ আজ থেকে ৬০০ বছর আগে কক্সবাজার থেকে ৮৬ কিলোমিটার দূরে মহেশখালী উপজেলার পাশে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে মাথা উঁচু করে একটি দ্বীপ। রহস্যময় এই দ্বীপে মানুষ পা রাখে পনেরো শতকে। হযরত কুতুবউদ্দীন নামে এক আধ্যাত্মিক সাধক কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে এখানেই আশ্রয় নেন। তখনকার সময় আরাকান অঞ্চলে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছেন নানাভাবে। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় কুতুবউদ্দিনের নাম জানতে পারেন। ভাগ্যান্বেষণেই তারা এই নতুন দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। কুতুবউদ্দিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই দ্বীপের নাম হয় ‘কুতুবউদ্দিনের দিয়া’। পরবর্তী সময়ে মানুষের মুখে ছড়াতে ছড়াতে তা হয়ে যায়, কুতুবদিয়া।

ভ্রমণ কিংবা পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও কুতুবদিয়া দ্বীপের বেশ সুনাম আছে। কক্সবাজার জেলার অধীনস্থ একটি উপজেলা হিসেবে পরিচিত কুতুবদিয়া দিয়েই কুতুবদিয়া চ্যানেলে প্রবেশ করা যায়। দেশে অনেকেই কুতুবদিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। যাত্রাটা কঠিন নয়। পেকুয়া মগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে সহজেই কুতুবদিয়া দ্বীপে পৌঁছানো যায়। 

কিন্তু দীর্ঘ যাত্রাপথ শেষে কুতুবদিয়ায় গেলে কী দেখবেন? কী আছে সেখানে? সে সব জানাতেই তো এলাম। 

দেশের যেকোনো প্রান্তেই থাকুন না কেন, আপনায় চট্টগ্রাম শহরেই আসতে হবে। এখানকার চান্দগাঁও থানা কিংবা নতুন ব্রিজ থেকে আনোয়ারা, বাঁশখালী দিয়ে পেকুয়া মগনামা বাজারে যেতে পারবেন। এছাড়া চকোরিয়া হয়েও যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ভাড়াটা এখন বেশিই পড়বে। ডিজেলের দাম বাড়ায় ভাড়াটা সম্ভবত বিরক্তিকর পর্যায়েই ঠেকেছে। যাত্রাটা বেশ লম্বা ও ক্লান্তিকর। নিরাপত্তার স্বার্থেই ভোর ভোর থাকতে রওয়ানা দিন।  

মগনামা বাজারে নেমে ব্যস্ত হওয়ার কিছুই নেই। এখানেই আছে ছোটখাটো পর্যটন কেন্দ্র। সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখতেই বহু মানুষের ভিড় হয় এখানে। চারদিকে জেটিঘাটে ব্যস্ততার নোনা ঘ্রাণ। ছোট ছোট নৌকা হেলতে দুলতে মাছ ধরতে এগিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। মগনামা থেকে যেহেতু গন্তব্য কুতুবদিয়া তাই এখানে বেশিক্ষণ সময় নষ্ট না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মগনামা জেটিঘাট থেকে কুতুবদিয়ায় বড়ঘোপ স্টিমারঘাটেও যেতে পারেন অথবা দরবারঘাটে যেতে পারেন। টাকা কম থাকলে চড়ে বসুন ডেনিশ বোটে। আর দ্রুত যেতে হলে স্পিডবোট তো আছেই।   

কুতুবদিয়া চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল সারাবছরই উত্তাল থাকে। তবে শীতে কিছুটা শান্ত সমাহিত থাকে। আসছে শীতে বরং কুতুবদিয়ার পরিকল্পনা করে নিলে মন্দ হবে না। সমুদ্রের ঢেউ তখন হালকা তালে ডেনিশ বোটে দোল দেবে। হাড় কাঁপানো হিম শীতল হাওয়া আপনায় নেবে কতদূরে! কিছুক্ষণেই দেখতে পাবেন কুতুবদিয়ার সুবিশাল ম্যানগ্রোভ বনভূমি। আধ ঘণ্টার সমুদ্রে ভাসার চ্যালেঞ্জ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং তো অবশ্যই। পৌঁছবেন বড়ঘোপ স্টিমারঘাট।

বড়ঘোপ স্টিমারঘাট সারাদিনই ব্যস্ত। মগনামা ঘাটে যাবেন সেই বোটের জন্যেও ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হবে। দ্বীপের বাসিন্দারা সারাদিন বিভিন্ন পণ্যবাহী নৌকায় যাতায়াত করেন। তবে যদি নৌকার যাত্রা ভালো না লাগে তাহলে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোতে যেতে পারেন।

কুতুবদিয়ায় গেলে প্রথমেই যা অবাক করবে তা হলো এখানকার রাস্তাঘাট একদম পাকা। যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ ভালো। এদিকে তেমন ভারী যানবাহন চলাচল করে না। নেই মানুষের হৈ হট্টগোল। পাবেন না গাড়ির কালো ধোঁয়ায় বিদঘুটে গন্ধ। চারপাশে অবশ্য অট্টালিকার পাহাড় না থাকায় জায়গাটাও খোলামেলা ও ন্যাড়া দেখায়। শীতে গেলে হিমশীতল বাতাস। নোনা ঘ্রাণে ইতিউতি তাকিয়েই দেখবেন অসংখ্য লবণের মাঠ সারি সারি। সেই লবণের মাঠে সাদার ওপর সোনা রঙের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। 

লবণের মাঠের পাশেও ফসলের ক্ষেত, শাকসবজি, ফল ফলাদির বিশাল আবাদি জমি। সেখানেও নারী-পুরুষ-শিশুর ব্যস্ততা। পর্যটক কিংবা শহুরে মানুষ নতুন কিছু না। তবু তারা মাথা উঁচিয়ে আপনায় হাসিমুখে দেখবে। লোকজনের আন্তরিকতা এখানে বেশ। শহরের দমবন্ধ অবস্থায় যেখানে কথা বলার লোকের অভাব, সেখানে সুস্থ নিঃশ্বাসের সন্ধানে কুতুবদিয়ার বিকল্প মেলা ভার।

কুতুবদিয়ায় ঘুরতে হলে আপনাকে নোঙর করতে হবে বড়ঘোপ বাজারে। এমনিতে পর্যটন এলাকা হিসেবে এই জায়গাটি বরাবরই উপেক্ষিত। উন্নত সুযোগ-সুবিধার অপর্যাপ্ততা তাই সহজেই লক্ষণীয়। এখানে ভালো রেস্টুরেন্ট নেই। তবে বড়ঘোপ বাজারেই কিছু ভালো খাবার হোটেল পাবেন। স্থানীয় মাছ, মাংস, শুটকি দিয়ে রান্না খাবার যথেষ্ট তৃপ্তি নিয়েই খেতে পারবেন।

আবাসন নিয়েও কিছুটা সমস্যায় পড়তে পারেন। সম্প্রতি বেশ কিছু মানসম্মত আবাসিক হোটেল এখানে গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ হোটেলই সমুদ্রের কাছেই। হোটেলে বসেই দিনরাত সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। কুতুবদিয়া দ্বীপটি ছোট। একদিনেই পুরোটা ঘুরে শেষ করে ফেলা যায়। সন্ধ্যে হলে ক্যাম্প করতে পারেন। অনেকেই এখানে ক্যাম্পিং করতে আসেন। বড়ঘোপ বাজার থেকে সোজা পশ্চিমের দিকে গেলেই কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত।

১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রতটেও ব্যস্ত থাকতে পারবেন। দ্বীপের বাইরে সমুদ্র সৈকতের পরিচিত এখনো তেমন ছড়িয়ে পড়েনি। তাই পর্যটকরা অন্তত এখানে আসেন না। স্থানীয় মানুষরাই এখানে নিত্যদিনের কাজ শেষ করেন। এর ভালো দিক হলো আশপাশে তেমন কৃত্রিম ময়লা কিংবা গিজগিজে হাল নেই। সমুদ্রতীর দিয়ে দক্ষিণে গেলে দৃষ্টিনন্দন ঝাউবন, মাছ ধরার সারি সারি নৌকা দেখতে পাবেন। এছাড়াও গাংচিলদের দিগ্বিদিক উড়ে বেড়ানো আবার বালুর ওপর নেমে থমকে চারপাশে তাকানোর দৃশ্যটিও মনোমুগ্ধকর। কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন মনোযোগ দিয়ে। জেলেরা ট্রলার নিয়ে ব্যস্ত। বালিতেই শিশুরা ফুটবল খেলছে। ফুটবলটির অবস্থা করুণ। বাতাসও কিছুটা কম আছে। তাও শিশুরা কী আনন্দে লাফ দিচ্ছে! সৈকতের পাশেই রয়েছে শুটকিপল্লী।

কুতুবদিয়ার বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়। এখানকার বাতাসের গড় গতি ৩.৪৩ মিটার/সেকেন্ড। মে থেকে আগস্ট মাসে উপকূলীয় বাতাসের গতি বেশি থাকে। এই গতি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে একটি বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে সৈকতের দক্ষিণ প্রান্তে আলী আকবর ডেইল এলাকায় ৫০টি উইন্ডমিল স্থাপিত হলেও অধিকাংশ এখন বিকল। অবশ্য ২০১৫ তে আরও ৫০টি হাইব্রিড উইন্ডমিল স্থাপন করা হয়। দেশের সর্ববৃহৎ বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও কুতুবদিয়ার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার সম্পূর্ণটি মেটাতে পারে না এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাই সন্ধ্যার পর কুতুবদিয়া ঢেকে যায় অন্ধকারে। হোটেলেই ফিরে যেতে হবে।

কিন্তু সাহসী হয়ে থাকলে আলী আকবর ডেইল জেটিঘাটে যেতে পারেন। সাগরে যে মাছ ধরা হয়, তার আশ্রয়কেন্দ্র এটি। এই ঘাট রাতে ভীষণ সুন্দর হয়ে ওঠে। চারপাশে অন্ধকারের রাজত্ব। ভাগ্য ভালো হলে মাথার ওপর পাবেন এক গৃহত্যাগী জোছনা। সারি সারি ট্রলারে মিটিমিটি আলো বিক্ষিপ্তভাবে থাকায় যেন তারার সমুদ্র এখানে। জাহাজের আওয়াজ আর এই আলোর পরিবেশের অনুভূতি পেতে হলে সশরীরেই আসতে হবে আপনাকে।

প্রথমদিনের ভ্রমণ শেষে ঘুরে আসুন ধুরুং এলাকার কুতুব দরবার শরীফে। ফেব্রুয়ারিতে গেলে এখানকার বড় ওরস পেয়ে যেতে পারেন। সেই অভিজ্ঞতা কুতুবদিয়া ভ্রমণকে আরও পূর্ণ করবে।

কুতুবদিয়া ভ্রমণ সম্পূর্ণ করতে যেতে হবে এখানকার বিখ্যাত বাতিঘর দেখতে। কুতুবদিয়ার একদম উত্তরেই দক্ষিণ ধুরুং এলাকায় এই বাতিঘর। ইস্পাতের কৌণিক দণ্ড ব্যবহারে ১৯৬৫ সালে বাতিঘরটি নির্মাণ করা হয়। এখানে তারও আগে থেকেই বাতিঘর নির্মাণ করা হয়েছি। ব্রিটিশ সরকারও আগে এখানে বাতিঘর বানিয়েছিলেন। অবশ্য আপনি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। বাহির থেকেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে। ভাটার সময়ে উপস্থিত থাকলে পুরোনো বাতিঘরের ধ্বংসাবশেষেরও দেখা মিলবে। তবে ফিরতে হলে সন্ধ্যার আগে আগেই ড্যানিশ বোট ধরবেন। সন্ধ্যার পর ফেরার আর উপায় নেই। আবার সকালের অপেক্ষা।

কুতুবদিয়া দ্বীপ আপনার শান্ত ভ্রমণের আদর্শ স্থান। আশপাশের যেকোনো দ্বীপ থেকে এই জায়গাটি কিছুটা উঁচুতে হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কিছুটা কম। দ্বীপাঞ্চলের বৈচিত্র্য উপভোগ করতে হলে, কুতুবদিয়ার বিকল্প পাওয়া মুশকিল।

Monday, October 6, 2014

মানুষের বানানো প্রাচীনতম ও দীর্ঘতম পানিপথ

চীনের ইতিহাসে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কমই আছে: মানুষের বানানো পৃথিবীর দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে প্রাচীনতম পানিপথ এটা, যা সুয়েজ খালের চেয়ে ৯ গুণ দীর্ঘ। এই খাল কাটা না হলে বেইজিং হয়তো কখনোই চীনের রাজধানী হয়ে উঠত না। আর এই খাল ছাড়া হয়তো চীন-ই চীন হয়ে উঠত না! এমন আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ‘বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল’ বা ‘বেইজিংয়ের বড় খাল’-কে এ বছরের জুন মাসে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে ইউনেসকো। সরেজমিন ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে এক ফটো ফিচারে এ সম্পর্কে জানিয়েছেন বিবিসির আমান্দা রুগেরি।

এ প্রজন্মের ‘বেইজিংগার’ বা বেইজিংয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে অল্প কিছু লোক যদিও বা বড় খাল ঘুরে দেখে থাকেন, তাহলে তার চেয়ে আরও কম পর্যটকই তা দেখেছেন। অবশ্য এই বড় খাল দক্ষিণ চীনে তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। সেখানে প্রমোদতরি আর বার্জগুলো এখনো ২ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো এই নৌপথে চলাচল করে। কিন্তু অনেক বেইজিংগারই জানেন না যে, তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ৩৫ কিলোমিটার দূরে বেইজিংয়ের তোংঝু উপশহর থেকে শুরু হওয়া এই হাতে কাটা খাল ১ হাজার ৭৯৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ব-চীনের ঝেইজিয়াং প্রদেশের রাজধানী হাংঝোও পর্যন্ত বিস্তৃত।

বেইজিংয়ের এই বড় খাল কাটতে কাটতে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৮০০ বছর। যে লাখ লাখ শ্রমিক এই খাল কাটতে গিয়ে জীবনতিপাত করেছেন, দুনিয়ার আর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভবত এত মানবসম্পদ কাজে লাগাতে হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৬ সালে এই খাল কাটার কাজ শুরু হয়। ৬০৫ সালের দিকে চীনের এক সাবেক রাজধানী লুয়োইয়াং থেকে কিংঝিয়াং পর্যন্ত এক হাজার কিলোমিটারের মতো খাল কাটা শেষ হয়েছিল। এর পাঁচ বছর পর ঝেনজিয়াং থেকে হাংঝোও পর্যন্ত আরও ৪০০ কিলোমিটার খাল কাটা শেষ হয়।

মানুষের বানানো এই দীর্ঘতম পানিপথে আরও জল গড়ানো বাকি ছিল তখনো। ৬১০ সালের দিকে এই খাল পৌঁছে যায় প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে। অন্ততপক্ষে ৩০ লাখ কৃষককে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল এখানে। ধারণা করা হয়ে থাকে, এই কৃষক-শ্রমিকদের অর্ধেকেরও বেশি কঠোর পরিশ্রম আর অনাহারে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু কুবলাই খান যখন ১২৭১ সালে কাইফেং বা লুয়োইয়াং থেকে রাজধানী স্থানান্তর করে বেইজিংয়ে নিয়ে আসেন, তখন আগের চেয়ে আরও বেশি কৃষক-শ্রমিককে জীবন উৎসর্গ করতে হয় এই খাল কাটার জন্য। এখনকার বেইজিং-হাংঝোও নৌপথের রূপ দিতে আরও ৪০০ কিলোমিটার খাল কাটতে হয়। সে সময় ১০ বছরে অন্তত ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন কুবলাই খানের নতুন রাজধানীকে আরও সরাসরি এই খালে যুক্ত করতে। ইউনেসকোর ভাষ্য অনুযায়ী, বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল ‘শিল্প বিপ্লবের আগে বাস্তবায়িত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এবং সুপরিসর পুর-কৌশল প্রকল্প’।

প্রাচীন চীন সাম্রাজ্যের জন্য নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই এত সাধনায় বাস্তবায়ন করা হয়েছিল এই খাল কাটা। নাগরিকদের খাদ্যনিরাপত্তা তার মধ্যে অন্যতম। ইয়াংসি অববাহিকা চীনের রুটির ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত হলেও খোদ ইয়াংসি নদীই পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত। কিন্তু শাসকেরা জানেন, ক্ষুধার্ত জনগণই বিদ্রোহ করে বসে আর না-খাওয়া সৈনিকেরা কোনো কাজে আসে না। ফলে এই খাল কাটার মধ্য দিয়ে চীনের শাসকেরা ইয়াংসি থেকে হলুদ নদী হোয়াংহো পর্যন্ত চাল বোঝাই নৌকা চলাচলের সুযোগ করে দিতে পেরেছিলেন। এই অববাহিকায় উৎপাদিত চালের মতোই উত্তর চীনে উৎপাদিত গমও এই নৌপথ দিয়েই দক্ষিণ চীনে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন তাঁরা। পাশাপাশি আরও কিছু ছোট ছোট খাল-নদীতে যুক্ত হয়ে এই নৌ-পথ রাজধানী বেইজিংকে ঘিরে চীনে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে।
যেকোনোও মহৎ সৃষ্টিই যেমন সৃজনের পথকে আরও প্রসারিত করে, ঠিক তেমনটাই ঘটেছে বেইজিং বড় খালের ক্ষেত্রে। ৫৮৭ সালেই সুই সাম্রাজ্যের শাসনামলে এই খালে দুনিয়ার প্রথম ‘লক গেট’ বানানো হয়েছিল। হোয়াংহো নদীর সঙ্গে এই খালের সংযোগ পথে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন গেট বসিয়েছিলেন প্রকৌশলী লিয়াং রুই। ৯৮৪ সালে আরেক প্রকৌশলী কিয়াও উইয়েও এই খালে প্রথম ‘পাউন্ড লক’ বানান। আধুনিক পানি-প্রযুক্তিতে অনেক খালেই আমরা এমন ধরনের ব্যবস্থা দেখি। এতে দুই পাশে ঘের দিয়ে একটা নিরাপদ পুকুরের মতো তৈরি করা হয় এবং পানির উচ্চতা কমে-বেড়ে স্থির না হওয়া পর্যন্ত নৌকাগুলো সেখানে অপেক্ষা করতে পারে। ১৯৭৩ সালে ইউরোপে প্রথমবারের মতো এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় নেদারল্যান্ডসের ভ্রিসভিকে।

১৯ শতকে চীনে রেলপথের প্রসারের পর থেকেই এই নৌপথের গুরুত্ব কমতে থাকে। গ্র্যান্ড ক্যানালের অনেক ছোট ছোট সংযোগ খালের সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৯৫৮ সালে মূল খালে একটা বড় ধরনের সংস্কারকাজ করা হয়। সে সময় থেকেই দক্ষিণ চীনে গুরুত্বের সঙ্গে নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা। অতি সম্প্রতি বেইজিং নগর হয়তো নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেছে ভুলে যাওয়া এই খালকে। ২০০৮ সালের অলিম্পিক গেমসের সময় এই খালের পাড় ধরে একটা অলিম্পিক পার্ক গড়ে তোলা হয়। গত বছর এই খালের পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘গ্র্যান্ড ক্যানাল ফরেস্ট পার্ক’। গাছ-গাছালি আর পাখ-পাখালিতে ভরা খাল পাড়ের এই উদ্যান এখন অনেক বেইজিংবাসীরই নজর কাড়ছে।


বেইজিং গ্র্যান্ড ক্যানাল কেবল মানুষের বানানো দীর্ঘতম ও প্রাচীনতম পানিপথ কিংবা এককালের সবচেয়ে বড় পুরকৌশল প্রকল্পই নয়, এটা আমাদের ধীরগতির পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেরও একটা নমুনা। আজকের দিনে বেইজিংয়ের বুলেট ট্রেন, কিংবা আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা আর পশ্চিমা ধাঁচের উন্নয়নের জোয়ারের আগে সভ্যতার অগ্রযাত্রায় চীনের অনন্য পথচলার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে মানুষের বানানো এই খাল। এই নৌপথ যথাযথভাবে সংস্কার করে এখানকার প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে মানুষের বানানো এই খালও হয়তো আগামী দুনিয়ায় চীনের বিশাল প্রাচীরের মতোই চীনের গর্ব হয়ে থাকবে।