Wednesday, December 24, 2025
কুতুবদিয়া দ্বীপের খোঁজে by আফরিদা ইফরাত
কুতুবদিয়া দ্বীপের খোঁজে by আফরিদা ইফরাত
ভ্রমণ কিংবা পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও কুতুবদিয়া দ্বীপের বেশ সুনাম আছে। কক্সবাজার জেলার অধীনস্থ একটি উপজেলা হিসেবে পরিচিত কুতুবদিয়া দিয়েই কুতুবদিয়া চ্যানেলে প্রবেশ করা যায়। দেশে অনেকেই কুতুবদিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। যাত্রাটা কঠিন নয়। পেকুয়া মগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে সহজেই কুতুবদিয়া দ্বীপে পৌঁছানো যায়।
কিন্তু দীর্ঘ যাত্রাপথ শেষে কুতুবদিয়ায় গেলে কী দেখবেন? কী আছে সেখানে? সে সব জানাতেই তো এলাম।
দেশের যেকোনো প্রান্তেই থাকুন না কেন, আপনায় চট্টগ্রাম শহরেই আসতে হবে। এখানকার চান্দগাঁও থানা কিংবা নতুন ব্রিজ থেকে আনোয়ারা, বাঁশখালী দিয়ে পেকুয়া মগনামা বাজারে যেতে পারবেন। এছাড়া চকোরিয়া হয়েও যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ভাড়াটা এখন বেশিই পড়বে। ডিজেলের দাম বাড়ায় ভাড়াটা সম্ভবত বিরক্তিকর পর্যায়েই ঠেকেছে। যাত্রাটা বেশ লম্বা ও ক্লান্তিকর। নিরাপত্তার স্বার্থেই ভোর ভোর থাকতে রওয়ানা দিন।
মগনামা বাজারে নেমে ব্যস্ত হওয়ার কিছুই নেই। এখানেই আছে ছোটখাটো পর্যটন কেন্দ্র। সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখতেই বহু মানুষের ভিড় হয় এখানে। চারদিকে জেটিঘাটে ব্যস্ততার নোনা ঘ্রাণ। ছোট ছোট নৌকা হেলতে দুলতে মাছ ধরতে এগিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। মগনামা থেকে যেহেতু গন্তব্য কুতুবদিয়া তাই এখানে বেশিক্ষণ সময় নষ্ট না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মগনামা জেটিঘাট থেকে কুতুবদিয়ায় বড়ঘোপ স্টিমারঘাটেও যেতে পারেন অথবা দরবারঘাটে যেতে পারেন। টাকা কম থাকলে চড়ে বসুন ডেনিশ বোটে। আর দ্রুত যেতে হলে স্পিডবোট তো আছেই।
কুতুবদিয়া চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল সারাবছরই উত্তাল থাকে। তবে শীতে কিছুটা শান্ত সমাহিত থাকে। আসছে শীতে বরং কুতুবদিয়ার পরিকল্পনা করে নিলে মন্দ হবে না। সমুদ্রের ঢেউ তখন হালকা তালে ডেনিশ বোটে দোল দেবে। হাড় কাঁপানো হিম শীতল হাওয়া আপনায় নেবে কতদূরে! কিছুক্ষণেই দেখতে পাবেন কুতুবদিয়ার সুবিশাল ম্যানগ্রোভ বনভূমি। আধ ঘণ্টার সমুদ্রে ভাসার চ্যালেঞ্জ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং তো অবশ্যই। পৌঁছবেন বড়ঘোপ স্টিমারঘাট।
বড়ঘোপ স্টিমারঘাট সারাদিনই ব্যস্ত। মগনামা ঘাটে যাবেন সেই বোটের জন্যেও ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হবে। দ্বীপের বাসিন্দারা সারাদিন বিভিন্ন পণ্যবাহী নৌকায় যাতায়াত করেন। তবে যদি নৌকার যাত্রা ভালো না লাগে তাহলে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোতে যেতে পারেন।
কুতুবদিয়ায় গেলে প্রথমেই যা অবাক করবে তা হলো এখানকার রাস্তাঘাট একদম পাকা। যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ ভালো। এদিকে তেমন ভারী যানবাহন চলাচল করে না। নেই মানুষের হৈ হট্টগোল। পাবেন না গাড়ির কালো ধোঁয়ায় বিদঘুটে গন্ধ। চারপাশে অবশ্য অট্টালিকার পাহাড় না থাকায় জায়গাটাও খোলামেলা ও ন্যাড়া দেখায়। শীতে গেলে হিমশীতল বাতাস। নোনা ঘ্রাণে ইতিউতি তাকিয়েই দেখবেন অসংখ্য লবণের মাঠ সারি সারি। সেই লবণের মাঠে সাদার ওপর সোনা রঙের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে।
লবণের মাঠের পাশেও ফসলের ক্ষেত, শাকসবজি, ফল ফলাদির বিশাল আবাদি জমি। সেখানেও নারী-পুরুষ-শিশুর ব্যস্ততা। পর্যটক কিংবা শহুরে মানুষ নতুন কিছু না। তবু তারা মাথা উঁচিয়ে আপনায় হাসিমুখে দেখবে। লোকজনের আন্তরিকতা এখানে বেশ। শহরের দমবন্ধ অবস্থায় যেখানে কথা বলার লোকের অভাব, সেখানে সুস্থ নিঃশ্বাসের সন্ধানে কুতুবদিয়ার বিকল্প মেলা ভার।
কুতুবদিয়ায় ঘুরতে হলে আপনাকে নোঙর করতে হবে বড়ঘোপ বাজারে। এমনিতে পর্যটন এলাকা হিসেবে এই জায়গাটি বরাবরই উপেক্ষিত। উন্নত সুযোগ-সুবিধার অপর্যাপ্ততা তাই সহজেই লক্ষণীয়। এখানে ভালো রেস্টুরেন্ট নেই। তবে বড়ঘোপ বাজারেই কিছু ভালো খাবার হোটেল পাবেন। স্থানীয় মাছ, মাংস, শুটকি দিয়ে রান্না খাবার যথেষ্ট তৃপ্তি নিয়েই খেতে পারবেন।
আবাসন নিয়েও কিছুটা সমস্যায় পড়তে পারেন। সম্প্রতি বেশ কিছু মানসম্মত আবাসিক হোটেল এখানে গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ হোটেলই সমুদ্রের কাছেই। হোটেলে বসেই দিনরাত সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। কুতুবদিয়া দ্বীপটি ছোট। একদিনেই পুরোটা ঘুরে শেষ করে ফেলা যায়। সন্ধ্যে হলে ক্যাম্প করতে পারেন। অনেকেই এখানে ক্যাম্পিং করতে আসেন। বড়ঘোপ বাজার থেকে সোজা পশ্চিমের দিকে গেলেই কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত।
১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রতটেও ব্যস্ত থাকতে পারবেন। দ্বীপের বাইরে সমুদ্র সৈকতের পরিচিত এখনো তেমন ছড়িয়ে পড়েনি। তাই পর্যটকরা অন্তত এখানে আসেন না। স্থানীয় মানুষরাই এখানে নিত্যদিনের কাজ শেষ করেন। এর ভালো দিক হলো আশপাশে তেমন কৃত্রিম ময়লা কিংবা গিজগিজে হাল নেই। সমুদ্রতীর দিয়ে দক্ষিণে গেলে দৃষ্টিনন্দন ঝাউবন, মাছ ধরার সারি সারি নৌকা দেখতে পাবেন। এছাড়াও গাংচিলদের দিগ্বিদিক উড়ে বেড়ানো আবার বালুর ওপর নেমে থমকে চারপাশে তাকানোর দৃশ্যটিও মনোমুগ্ধকর। কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন মনোযোগ দিয়ে। জেলেরা ট্রলার নিয়ে ব্যস্ত। বালিতেই শিশুরা ফুটবল খেলছে। ফুটবলটির অবস্থা করুণ। বাতাসও কিছুটা কম আছে। তাও শিশুরা কী আনন্দে লাফ দিচ্ছে! সৈকতের পাশেই রয়েছে শুটকিপল্লী।
কুতুবদিয়ার বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়। এখানকার বাতাসের গড় গতি ৩.৪৩ মিটার/সেকেন্ড। মে থেকে আগস্ট মাসে উপকূলীয় বাতাসের গতি বেশি থাকে। এই গতি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে একটি বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে সৈকতের দক্ষিণ প্রান্তে আলী আকবর ডেইল এলাকায় ৫০টি উইন্ডমিল স্থাপিত হলেও অধিকাংশ এখন বিকল। অবশ্য ২০১৫ তে আরও ৫০টি হাইব্রিড উইন্ডমিল স্থাপন করা হয়। দেশের সর্ববৃহৎ বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও কুতুবদিয়ার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার সম্পূর্ণটি মেটাতে পারে না এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাই সন্ধ্যার পর কুতুবদিয়া ঢেকে যায় অন্ধকারে। হোটেলেই ফিরে যেতে হবে।
কিন্তু সাহসী হয়ে থাকলে আলী আকবর ডেইল জেটিঘাটে যেতে পারেন। সাগরে যে মাছ ধরা হয়, তার আশ্রয়কেন্দ্র এটি। এই ঘাট রাতে ভীষণ সুন্দর হয়ে ওঠে। চারপাশে অন্ধকারের রাজত্ব। ভাগ্য ভালো হলে মাথার ওপর পাবেন এক গৃহত্যাগী জোছনা। সারি সারি ট্রলারে মিটিমিটি আলো বিক্ষিপ্তভাবে থাকায় যেন তারার সমুদ্র এখানে। জাহাজের আওয়াজ আর এই আলোর পরিবেশের অনুভূতি পেতে হলে সশরীরেই আসতে হবে আপনাকে।
প্রথমদিনের ভ্রমণ শেষে ঘুরে আসুন ধুরুং এলাকার কুতুব দরবার শরীফে। ফেব্রুয়ারিতে গেলে এখানকার বড় ওরস পেয়ে যেতে পারেন। সেই অভিজ্ঞতা কুতুবদিয়া ভ্রমণকে আরও পূর্ণ করবে।
কুতুবদিয়া ভ্রমণ সম্পূর্ণ করতে যেতে হবে এখানকার বিখ্যাত বাতিঘর দেখতে। কুতুবদিয়ার একদম উত্তরেই দক্ষিণ ধুরুং এলাকায় এই বাতিঘর। ইস্পাতের কৌণিক দণ্ড ব্যবহারে ১৯৬৫ সালে বাতিঘরটি নির্মাণ করা হয়। এখানে তারও আগে থেকেই বাতিঘর নির্মাণ করা হয়েছি। ব্রিটিশ সরকারও আগে এখানে বাতিঘর বানিয়েছিলেন। অবশ্য আপনি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। বাহির থেকেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে। ভাটার সময়ে উপস্থিত থাকলে পুরোনো বাতিঘরের ধ্বংসাবশেষেরও দেখা মিলবে। তবে ফিরতে হলে সন্ধ্যার আগে আগেই ড্যানিশ বোট ধরবেন। সন্ধ্যার পর ফেরার আর উপায় নেই। আবার সকালের অপেক্ষা।
কুতুবদিয়া দ্বীপ আপনার শান্ত ভ্রমণের আদর্শ স্থান। আশপাশের যেকোনো দ্বীপ থেকে এই জায়গাটি কিছুটা উঁচুতে হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কিছুটা কম। দ্বীপাঞ্চলের বৈচিত্র্য উপভোগ করতে হলে, কুতুবদিয়ার বিকল্প পাওয়া মুশকিল।
About: বাংলা খবর
The Island, KUTUBDIA is famous for THE LIGHT - HOUSE. It contains all the mysteries of the creation. It is surrounded by the Bay Of Bengal. I am telling about The Divine Beauty Of A Land, Kutubdia. Though it is very small in size, It has the ability to lead all the huge land by its Natural Beauty. God decorated it with His own hands. The Sea Beatch Of it is very attractive and It is not less qualified than Cox's Bazr Sea Beatch...
You may also like...
eKutubdia Special
-
৬৪ দিন সূর্য দেখবে না যুক্তরাষ্ট্রের যে শহর - *২২ নভেম্বর ২০২৫ঃ* যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহর একটানা কয়েক মাস অন্ধকারে ডুবে থাকবে। শহরটি হলো আলাস্কার উটকিয়াগভিক। এই শহরের বাসিন্দারা সূর্যকে বিদায় জানাচ্ছেন।...12 hours ago
Recent Posts
Popular Posts
-
কুতুবদিয়ার বাতিঘর এখানে শরতের সকালে যেন অন্য রকম এক আয়োজন চলছে। নদীর বুকে ঠিকরে পড়ছে কোমল আলো। যাত্রীরা পড়িমরি করে উঠছে সমুদ্রগা...
-
বাংলাদেশে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি আটক, গ্রেপ্তারের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে৷ আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মী...
-
স্বপ্নপূরণ হলো না কবিতার। লেখাপড়া শিখে দেশের সেবা করার স্বপ্ন ছিল তার। এ কারণেই পিতার বাড়ি ছেড়ে নানার বাড়ি থেকে লেখাপড়া করতো। কিন্তু ব...
-
ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভোলায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। গত রোববার পর্যন্ত মাঝারি ও ছোট আকারের ...
-
রংপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত জাপানি নাগরিক কুনিও হোশির লাশ স্থানীয় মুন্সিপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। গতরাত আড়াইটার পর কোনো এক সম...
No comments:
Post a Comment